দেশজুড়ে টানা বিক্ষোভ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে ইরান গভীর সংকটে। তবু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশটির শাসনব্যবস্থায় ভাঙনের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ইরানের শক্ত ও বহুস্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা কাঠামো এবং শীর্ষ পর্যায়ে ঐক্যের অভাব না থাকা।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকেই চাপ আরও বেড়েছে। তবে রাস্তায় অস্থিরতা কিংবা বাইরের চাপ—কোনোটিই এখনো ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিতে হলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতর থেকে দলত্যাগ বা ভাঙন জরুরি। কিন্তু বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও আধা-সামরিক বাসিজ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সদস্যের শক্ত কাঠামো এখনো সরকারকে আগলে রেখেছে। ইরানি-আমেরিকান শিক্ষাবিদ ভালি নাসরের ভাষায়, “রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই যদি ফাটল না ধরে, তাহলে কেবল বাইরের চাপ দিয়ে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন।”
বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। ইরানি এক কর্মকর্তার দাবি, প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মৃত্যুর জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৬০০-এর কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ বলছে, তারা ৫৭৩ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তারের খবর পেয়েছে।
বর্তমান আন্দোলনটি ২০০৯ সালের পর ইরানের পঞ্চম বড় গণবিক্ষোভ। ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অতীতেও একাধিক অস্থিরতা কাটিয়ে টিকে গেছেন। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেমের মতে, এটি শাসনব্যবস্থার এক ধরনের স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ, যদিও ভেতরের সংকটগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, টিকে থাকা আর স্থিতিশীল থাকা এক বিষয় নয়। নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত, পুনরুদ্ধারের পথ অনিশ্চিত। পারমাণবিক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত, আর লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোও বড় ধাক্কা খেয়েছে। এসব মিলিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি।
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে। পরে তা সরাসরি শাসকগোষ্ঠীবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়ায় সরকারের অবশিষ্ট রাজনৈতিক বৈধতাও ক্ষয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সতর্কবার্তা। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। যদিও হোয়াইট হাউস এখনো স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি, তবু ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের কিছু মহলে ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’—অর্থাৎ শীর্ষ নেতৃত্ব সরিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের জায়গায় রাখার ধারণা—নিয়ে আলোচনা চলছে।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এই মডেল কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। বিশাল ভূখণ্ড, জটিল জাতিগত বাস্তবতা এবং দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বিদেশি সামরিক পদক্ষেপ দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করছেন আঞ্চলিক কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান এখনো ‘পতনের মুহূর্তে’ পৌঁছায়নি। তবে সামনে পথ যে আরও কঠিন, সে বিষয়ে তেমন কোনো দ্বিমত নেই।